যশোরের শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে অবস্থিত দেশের অন্যতম শীর্ষ অনলাইন গ্রোসারি শপ 'চালডাল ডটকম'-এর কার্যালয়ে এক নজিরবিহীন শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ চার মাস ধরে বেতনবঞ্চিত প্রায় ৬০০ কর্মীর পুঞ্জীভূত ক্ষোভ সোমবার (০২ মার্চ) সকালে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বেতন আদায়ের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে কর্তৃপক্ষের পালটা 'দমনমূলক' আচরণ এবং হঠাৎ 'সাধারণ ছুটি' ঘোষণা শ্রমিকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত রোববার রাতে। নাইট শিফটের কর্মীরা বকেয়া বেতনের দাবিতে কাজ বন্ধ করে অফিস ভবনের ১২ তলায় অবস্থান নেন। সোমবার সকালে ইভেনিং শিফটের শত শত কর্মী তাদের সাথে যোগ দিলে আন্দোলনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়। আন্দোলনরত কর্মীদের অভিযোগ, গত চার মাস ধরে তারা কোনো পারিশ্রমিক পাননি। বাসা ভাড়া, খাবারের বিল এবং দৈনন্দিন খরচ মেটাতে না পেরে তারা এখন দিশেহারা। অথচ বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাদের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসেননি।
আন্দোলনের এক পর্যায়ে সোমবার সকালে কর্তৃপক্ষের অনুসারী কিছু লোক এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও ধাক্কাধাক্কির সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেওয়া কর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে সংঘর্ষ বাধে। এতে শাকিল (২১) নামে চালডালের একজন অনলাইন এজেন্ট গুরুতর আহত হন। শাকিল সদর উপজেলার তালবাড়িয়া শান্তির মোড় এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে। তাকে উদ্ধার করে দ্রুত যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, শাকিল বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত হলেও তার শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সামনে না এসে তাদের অনুগত কিছু লোককে ব্যবহার করে শ্রমিকদের ওপর হামলা ও চাপ প্রয়োগ করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কোনো ফলপ্রসূ পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো সকালে কার্যালয়ের গেটে 'সাধারণ ছুটি'র নোটিশ টাঙিয়ে দেয় চালডাল কর্তৃপক্ষ। এই নোটিশ দেখে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যে, কর্তৃপক্ষ হয়তো অনির্দিষ্টকালের জন্য অফিস বন্ধ করে তাদের পাওনা থেকে বঞ্চিত করতে চাইছে। ১২ তলায় অবস্থানরত কর্মীরা জানান, তারা এখন ভেতরে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তারা বলেন, "আমরা চোর বা ডাকাত নই, আমরা আমাদের হাড়ভাঙা খাটুনির পাওনা চাইছি। কিন্তু আমাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে এবং অফিস বন্ধ করে আমাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।"
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে চালডাল ডটকমের উপ-পরিচালক আজিজুর রহমান জিকো শ্রমিকদের সকল অভিযোগ স্বীকার করেননি। তিনি দাবি করেন, "ডিসেম্বর মাসের বেতন ইতিমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। কোম্পানির ফান্ডে বর্তমানে কিছুটা সাময়িক সমস্যা রয়েছে। দেশে নতুন সরকার আসছে, আশা করছি দ্রুতই ফান্ড সমস্যার সমাধান হবে এবং বাকি বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব হবে।"
তবে কর্তৃপক্ষের এই দাবিকে পুরোপুরি 'মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর' বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন আন্দোলনরত শ্রমিকরা। তাদের দাবি, ডিসেম্বরের বেতন পাওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং তারা গত চার মাস ধরে এক টাকাও ঘরে নিতে পারেননি। তাদের মতে, সরকার পরিবর্তনের দোহাই দিয়ে কর্তৃপক্ষ সময়ক্ষেপণ করছে।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত যশোর আইটি পার্ক এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। শ্রমিকরা তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছেন। তাদের সুস্পষ্ট তিনটি দাবি হলো: অবিলম্বে গত চার মাসের সকল বকেয়া বেতন এবং পাওনাদি পরিশোধ করতে হবে। আহত কর্মী শাকিলের ওপর হামলার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।কোনো ধরনের ছাঁটাই বা হয়রানি করা হবে না—এমন লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।যশোর আইটি পার্কের মতো একটি আধুনিক প্রযুক্তি কেন্দ্রে এ ধরনের শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা পুরো অঞ্চলের আইটি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ মার্চ ২০২৬
যশোরের শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে অবস্থিত দেশের অন্যতম শীর্ষ অনলাইন গ্রোসারি শপ 'চালডাল ডটকম'-এর কার্যালয়ে এক নজিরবিহীন শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ চার মাস ধরে বেতনবঞ্চিত প্রায় ৬০০ কর্মীর পুঞ্জীভূত ক্ষোভ সোমবার (০২ মার্চ) সকালে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বেতন আদায়ের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে কর্তৃপক্ষের পালটা 'দমনমূলক' আচরণ এবং হঠাৎ 'সাধারণ ছুটি' ঘোষণা শ্রমিকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত রোববার রাতে। নাইট শিফটের কর্মীরা বকেয়া বেতনের দাবিতে কাজ বন্ধ করে অফিস ভবনের ১২ তলায় অবস্থান নেন। সোমবার সকালে ইভেনিং শিফটের শত শত কর্মী তাদের সাথে যোগ দিলে আন্দোলনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়। আন্দোলনরত কর্মীদের অভিযোগ, গত চার মাস ধরে তারা কোনো পারিশ্রমিক পাননি। বাসা ভাড়া, খাবারের বিল এবং দৈনন্দিন খরচ মেটাতে না পেরে তারা এখন দিশেহারা। অথচ বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাদের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসেননি।
আন্দোলনের এক পর্যায়ে সোমবার সকালে কর্তৃপক্ষের অনুসারী কিছু লোক এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও ধাক্কাধাক্কির সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেওয়া কর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে সংঘর্ষ বাধে। এতে শাকিল (২১) নামে চালডালের একজন অনলাইন এজেন্ট গুরুতর আহত হন। শাকিল সদর উপজেলার তালবাড়িয়া শান্তির মোড় এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে। তাকে উদ্ধার করে দ্রুত যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, শাকিল বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত হলেও তার শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সামনে না এসে তাদের অনুগত কিছু লোককে ব্যবহার করে শ্রমিকদের ওপর হামলা ও চাপ প্রয়োগ করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কোনো ফলপ্রসূ পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো সকালে কার্যালয়ের গেটে 'সাধারণ ছুটি'র নোটিশ টাঙিয়ে দেয় চালডাল কর্তৃপক্ষ। এই নোটিশ দেখে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যে, কর্তৃপক্ষ হয়তো অনির্দিষ্টকালের জন্য অফিস বন্ধ করে তাদের পাওনা থেকে বঞ্চিত করতে চাইছে। ১২ তলায় অবস্থানরত কর্মীরা জানান, তারা এখন ভেতরে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তারা বলেন, "আমরা চোর বা ডাকাত নই, আমরা আমাদের হাড়ভাঙা খাটুনির পাওনা চাইছি। কিন্তু আমাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে এবং অফিস বন্ধ করে আমাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।"
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে চালডাল ডটকমের উপ-পরিচালক আজিজুর রহমান জিকো শ্রমিকদের সকল অভিযোগ স্বীকার করেননি। তিনি দাবি করেন, "ডিসেম্বর মাসের বেতন ইতিমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। কোম্পানির ফান্ডে বর্তমানে কিছুটা সাময়িক সমস্যা রয়েছে। দেশে নতুন সরকার আসছে, আশা করছি দ্রুতই ফান্ড সমস্যার সমাধান হবে এবং বাকি বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব হবে।"
তবে কর্তৃপক্ষের এই দাবিকে পুরোপুরি 'মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর' বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন আন্দোলনরত শ্রমিকরা। তাদের দাবি, ডিসেম্বরের বেতন পাওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং তারা গত চার মাস ধরে এক টাকাও ঘরে নিতে পারেননি। তাদের মতে, সরকার পরিবর্তনের দোহাই দিয়ে কর্তৃপক্ষ সময়ক্ষেপণ করছে।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত যশোর আইটি পার্ক এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। শ্রমিকরা তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছেন। তাদের সুস্পষ্ট তিনটি দাবি হলো: অবিলম্বে গত চার মাসের সকল বকেয়া বেতন এবং পাওনাদি পরিশোধ করতে হবে। আহত কর্মী শাকিলের ওপর হামলার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।কোনো ধরনের ছাঁটাই বা হয়রানি করা হবে না—এমন লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।যশোর আইটি পার্কের মতো একটি আধুনিক প্রযুক্তি কেন্দ্রে এ ধরনের শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা পুরো অঞ্চলের আইটি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন