
দিপক চন্দ্র দেব,হোমনা (কুমিল্লা)
কুমিল্লার হোমনা উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির একাংশের বিরুদ্ধে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় শিক্ষক সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
ভিটিকালমিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও সভাপতি বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি হোমনা উপজেলা শাখা মো. মুসলেহ উদ্দিন ১৫ অক্টোবর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-র বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সহকারী শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান, মো. নজরুল ইসলাম, হাসান উদ্দিন মোল্লা, মো. ইমান উদ্দিন, মো. ইকবাল হোসেন, জামির হোসেন, মো. মহসীন ও প্রধান শিক্ষক মো. শাহীনসহ কয়েকজন শিক্ষক “বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি”র নামে একটি ভুয়া ‘পকেট কমিটি’ গঠন করে হোমনা থানা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির অফিস দখল করেন।
পরবর্তীতে তারা সমিতির হিসাব থেকে ১৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা এবং মার্কেটের ১৪ মাসের ভাড়া বাবদ আরও প্রায় ১৪ লাখ টাকা সাধারণ শিক্ষকদের অনুমোদন বা রেজুলেশন ছাড়াই বেআইনিভাবে উত্তোলন করে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
জানা যায়, ১৯৬২ সালে হোমনা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাসিক চাঁদা থেকে সংগৃহীত অর্থে উপজেলা সদরে ২৪ শতাংশ জায়গা ক্রয় করে সেখানে একটি মার্কেট নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে ওই মার্কেট থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার টাকা ভাড়া পাওয়া যায়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, দোকান বরাদ্দে শিক্ষক পরিবারের অগ্রাধিকার থাকার কথা থাকলেও কোনো শিক্ষক বা শিক্ষক পরিবারের সদস্যকে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রধান শিক্ষক জানান,
“কয়েকজন সহকারী শিক্ষক, শিক্ষক সমাজের কল্যাণের নামে সমিতি দখল করে ব্যক্তিগত স্বার্থে অর্থ ব্যবহার করছেন। অথচ এই কমিটি সাধারণ শিক্ষকদের ভোটে নির্বাচিত নয়, এমনকি অনুমোদিতও নয়। সমিতিতে অনেক শিক্ষকের নাম সদস্য হিসেবে দেখানো হয়েছে, যাদের অনেকে বিষয়টি জানেনই না। প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ তদন্ত করে, তাহলে সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
অন্যদিকে কথিত সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নাম থাকা মো. নজরুল ইসলাম বলেন,
“আমি এই সমিতির সাথে যুক্ত নই। আমার নাম ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো আর্থিক লেনদেনে আমি জড়িত নই।”
সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম ভূঁইয়া বলেন,
“আমরা দায়িত্বে থাকাকালে সমিতির একাউন্টে ১৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা জমা রেখেছি। পরে তারা দায়িত্ব নেয়। এরপর থেকে আরও ১৪ মাসের ভাড়ার টাকা জমা হওয়ার কথা।”
উপজেলা প্রধান শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম বলেন,
“এই মার্কেট হোমনা উপজেলার ৯২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্পদ। এর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। নতুবা শিক্ষক সমিতির প্রতি শিক্ষকদের আস্থা হারিয়ে যাবে। পাশাপাশি দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে একটি বৈধ কমিটি গঠনের আহ্বান জানাই।”
অভিযোগ প্রসঙ্গে বর্তমান সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান বলেন,
“আমরা কোনো অনিয়ম করিনি। নিয়ম মেনেই ব্যয় করছি, সব খরচের বিল–ভাউচার রয়েছে। বরং অভিযোগকারীদের সময়েই কোনো সঠিক হিসাব ছিল না।”
হোমনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ক্ষেমালিকা চাকমা জানান,
“লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে আগামী ৪ নভেম্বর শুনানির জন্য নোটিশ জারি করা হয়েছে। শুনানি শেষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”